আমাদের জাতীয় পতাকা/ ভারতের জাতীয় পতাকা সূচনা : প্রত্যেকটি স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা সেই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। পতাকা একটি জাতি,দল, দেশ বা সংগঠনের প্রতীক তথা পরিচায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই একটি নিজস্ব পতাকা আছে, যা জাতীয় পতাকা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে ভাবেRead more
আমাদের জাতীয় পতাকা/ ভারতের জাতীয় পতাকা
সূচনা : প্রত্যেকটি স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা সেই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। পতাকা একটি জাতি,দল, দেশ বা সংগঠনের প্রতীক তথা পরিচায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি দেশেরই একটি নিজস্ব পতাকা আছে, যা জাতীয় পতাকা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। সে ভাবে ভারতবর্ষের ও একটি নিজস্ব জাতীয় পতাকা আছে যা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রকাশ করে।
আমাদের জাতীয় পতাকার বিবরণ : ভারতের জাতীয় পতাকা তিনটি রং দিয়ে তৈরী।উপরে গেরুয়া মধ্যে সাদা ও নিচে সবুজ।পতাকার ঠিক মধ্যেখানে আছে চব্বিশটি দণ্ডযুক্ত নীল “অশোকচক্র”।তিনটি রং থাকার দরুন আমাদের জাতীয় পতাকাকে সাধারণত “ত্রিরঙ্গা পতাকা” বা “ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা” বলা হয়।১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই এই পতাকার বর্তমান রূপটি ভারতবর্ষের সরকারি পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
জাতীয় পতাকার ইতিহাস : ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর্বে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রং ও আকারের পতাকা ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ভারতের স্বাধীনতার সময় জাতীয় পতাকার বাছাই নিয়ে অনেক বিবাদ দেখা দে। শেষ পর্যন্ত “পিঙ্গালি ভেঙ্কাইয়া” ধারা তৈরী তিরঙ্গা জাতীয় পতাকা হিসাবে গৃহীত হয়। এই পতাকায় আনুভূমিক গেরুয়া, সাদা ও সবুজের মধ্যস্থলে একটি চরকা খচিত ছিল। গেরুয়া ত্যাগ; সাদা সত্য ও শান্তি এবং সবুজ বিশ্বাস ও প্রগতির প্রতীক তথা চরকা ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও দেশবাসীর শ্রমশীলতার প্রতীক হিসেবে গৃহীত হয়। পবর্তীকালে চরকার স্থলে অশোকচক্র যুক্ত করে ইহাকে ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা হিসাবে গ্রহণ করা হয়।
পতাকা ব্যবহারের নিয়ম : পতাকা উত্তোলনের বিশেষ কয়েকটি দিন রয়েছে তারমধ্যে স্বাধীনতা দিবস, গণতন্ত্র দিবস অন্যতম। এই দিনগুলোতে প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন অফিস আদালত ও সরকারি- বেসরকারি কার্যালয় গুলোতে পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা কোনো একটি উঁচু জায়গায় উত্তোলন করা হয়। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পতাকা উড়িয়ে রাখা হয় এবং আঁধার নামিয়ে আসলে পতাকা নামিয়ে নেওয়া হয়। এই দিন গুলি ছাড়া কোনো বিশেষ ব্যক্তির মৃত্যু হলে অর্ধেক উত্তোলন করা হয়।তাছাড়া জাতীয় পতাকা কুচকাওয়াজ প্রদর্শনী, বিশেষ প্রদর্শনী, সরকারি অফিস ও আদালতে বছরের যে কোনো সময়ে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
জাতীয় পতাকার মাহাত্ম্য : জাতীয় পতাকা ভারতবর্ষের পরিচয়ের প্রতীক, প্রত্যেক ভারতীয় মানুষের গর্বের প্রতীক, আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রের অখন্ডতার চিহ্ন। জাতীয় পতাকার প্রতি অবিচল আস্থা, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।ভারতীয় আইন অনুসারে জাতীয় পতাকার ব্যবহার সর্বদা “মর্যাদা, আনুগত্য ও সম্মান সহকারে হওয়া উচিত।জাতীয় পতাকার অপব্যবহার ও অমর্যাদা করা অত্যন্ত জগন্য ও শাস্তিমূলক অপরাধ।
উপসংহার : ভারতের জাতীয় পতাকা আমাদের গর্বের প্রতীক, আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক।আমরা অনেক সংগ্রাম ও কষ্টের পর এই পতাকাকে অর্জন করেছি। তাই এই পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মর্যাদা ভারতীয় হিসাবে প্রথম দায়িত্ব ও কর্তব্য। ভারতের জাতীয় পতাকার মান যাতে অক্ষুন্ন থাকে সেই জন্য আমাদেরকে এই লক্ষ্যে কাজ করা উচিত।
See less
দূর্গা পূজা বা দুর্গোৎসব ভূমিকাঃ দুর্গোৎসব বা দুর্গাপূজা জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতায় বাংলার অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। দুর্গোৎসব নিয়ে আসে বাংলার জীবনে এক নতুন মাত্রা, বাংলার মানুষ মেতে উঠে খুশিতে আনন্দে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের খুব কম উৎসবের সঙ্গেই তার তুলনা চলে। যদিও এটি মূলত: ধর্মীয় অনুষ্ঠান তবুও সকল শ্রেRead more
দূর্গা পূজা বা দুর্গোৎসব
ভূমিকাঃ দুর্গোৎসব বা দুর্গাপূজা জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতায় বাংলার অন্যতম ধর্মীয় উৎসব। দুর্গোৎসব নিয়ে আসে বাংলার জীবনে এক নতুন মাত্রা, বাংলার মানুষ মেতে উঠে খুশিতে আনন্দে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের খুব কম উৎসবের সঙ্গেই তার তুলনা চলে। যদিও এটি মূলত: ধর্মীয় অনুষ্ঠান তবুও সকল শ্রেণীর জনসাধারণের আন্তরিক মিলনের ফলে এক উদারতর সামাজিক ব্যপ্তি লাভ করেছে। সর্বমানবের মিলনই যদি জাতীয় উৎসবের বৈশিষ্ট্য হয়, তবে দুর্গোৎসবকে নিঃসন্দেহে বাংলা ও বাঙালী জাতির জাতীয় উৎসবরূপে স্বীকার করতে হবে।
সময় ও প্রস্তুতি : বৎসরের সুন্দরতম ঋতুতে বাংলার নিসর্গ-প্রকৃতি যখন সুস্নিগ্ধ লাবণ্যে অপরূপ হয়ে ওঠে, তখনই দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শারদ এই শুভলগ্নে প্রকৃতিই প্রকৃতি হয়ে উঠে নির্মেঘ আকাশ হয়ে উঠে সুনীল এরইমধ্যে প্রকৃতি তাঁর স্বর্ণোজ্জ্বল রৌদ্রের প্রদীপালােকে জগন্মাতার বন্দনার আয়ােজন করে। শরৎ ঋতুর আগমনে মৃৎ-শিল্পীর দিবারাত্রির পরিশ্রমে দেবী দুর্গা মৃন্ময়ীরূপে দৃষ্টিগােচর হয়ে ওঠেন, বিপণিতে নয়নলােভন পণ্য আনন্দোচ্ছল ক্রেতার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। প্রবাসী কর্মীর দিন কাটে প্রিয়জনের সঙ্গে মিলনের প্রতীক্ষায়। অবশেষে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতিথির পুণ্যলগ্নে কল্যাণী জননী-রূপে দেবী দুর্গা তাঁর মর্তের সন্তানদের সম্মুখে আবির্ভূত হন। গ্রাম-বাঙলার শারদ আকাশে বাজতে থাকে আগমনীর সুর।
দুর্গাপূজার ইতিহাস : ইতিহাস পুরাণে বিধৃত। গিরিরাজ হিমালয় ও তদীয় পত্রী মেনকার কন্যা এই দুর্গা, দেবাদিদেব মহাদেব তাঁর স্বামী। সত্যযুগে সুরথ নামক জনৈক নরপতি শহস্তে পরাজিত হয়ে হতাশচিত্তে মেধস্ মুনির আশ্রমে যান। এই মুনির উপদেশেই তিনি সর্বপ্রথম দুর্গাপূজা করেন এবং দেবীর কৃপায় শত্রুকবলিত রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন। রাজা সুরথ বসন্তঋতুতে দুর্গাপূজা করেছিলেন বলে এই পূজা বাসন্তী পূজা’ নামে অভিহিত হয় । বাঙালী দেবী দুর্গার আরাধনায় রামচন্দ্রের শারদীয় অনুষ্ঠানকে গ্রহণ করেছে। তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ প্রায় সাড়ে তিনশত বৎসর পূর্বে সর্বপ্রথম বাঙলাদেশে জগজ্জননীর পূজায় ব্রতী হন, এরূপ মত প্রচলিত আছে।
দুর্গা দশভুজা : তার দশটি হাতে শাণিত প্রহরণ। সিংহপৃষ্ঠে আরােহণ করে তিনি ভীষণদর্শন মহিষাসুর নিধনে উদ্যত। শক্তিরূপিণী জননী দুর্গার দক্ষিণে শােভা পান ঐশ্বর্যের দেবী কমলাসনা লক্ষ্মী, বামভাগে অবস্থান করেন বাণী বিদ্যাদায়িনী সর্বশুক্লা সরস্বতী। দুই পুত্র দেবসেনাপতি কার্তিকেয় এবং সিদ্ধিদাতা গণেশও একই সঙ্গে পূজিত হন । গণেশের পার্শ্বে প্রকৃতি-জননীর সৃষ্টির প্রতীক নবপত্রিকা অবস্থান করেন । অসুররূপী অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে বিশ্ববাসীকে শাস্তি ও কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্যই আদ্যাশক্তি মহামায়া দশপ্রহরণ ধারিণী দুর্গারূপে আত্মপ্রকাশ।
মূল উৎসব : আলােকোজ্জ্বল আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে বােধন করে দুর্গাপুজার অনুষ্ঠান শুরু হয়। পুণ্য ষষ্ঠী তিথিতেই দেবীর আবাহন ও অধিবাসের কার্যটি সম্পন্ন করা হয়। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী–পরবর্তী এই তিনটি দিন ধরে মহাসমারােহে অগণিত ভক্তের সম্মিলনে পূজা চলতে থাকে। অষ্টম ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে যে পূজা অনুষ্ঠিত হয়, তার নাম ‘সন্ধিপূজা’ । চতুর্থ দিন দশমী তিথিতে পূজা সমাপন করে দেবীকে বিসর্জন দেওয়া হয় । বিসর্জনের পরবর্তী কৃত্যই হল প্রতিমা। নিরঞ্জন—অর্থাৎ বাদ্যভাণ্ড ও শোভাযাত্রা সহকারে দেবী প্রতিমাকে নদী-গর্ভে অথবা অন্য কোন জলাশয়ে নিমজ্জিত করা হয়। ভক্ত-পূজকদের দেহে নামে ক্লান্তির ভার, মন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে প্রিয়জন বিচ্ছেদের বিষাদে। প্রতিমা নিরঞ্জনের পরে প্রতিটি বাঙালী আত্মীয় প্রিয়জনের সঙ্গে স্নেহালিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে পরস্পরকে ভক্তি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছাজ্ঞাপন করে, এই অনুষ্ঠানটির নাম ‘বিজয়া।
বাংলার জীবনে দুর্গ উৎসবের মাহাত্ম্য : শুধু যে ধর্মীয় গুরুত্বেই জগন্মাতা দুর্গার আরাধনা বাঙালী হিন্দুর জীবনে প্রধানতম স্থান গ্রহণ করেছে তাই নয়, মানবিক সম্পর্কের সহজ আন্তরিকতার স্পশে এ উৎসবটি অনন্য। হিমালয়-দুহিতা উমা পুত্র-কন্যা সঙ্গে নিয়ে মাত্র তিনটি দিনের জন্য পিতৃগৃহে ফিরে আসেন, চতুর্থ দিনেই আবার মাতা মেনকাকে অশ্রু সাগরে ভাসিয়ে স্বামী মহেশ্বরের আলয়ে প্রত্যাবর্তন করেন । মর্ত্য-পৃথিবীতে দেবী দুর্গার আবির্ভাবের এই লৌকিক কাহিনীটি বাঙালীর পারিবারিক জীবনে একটি বিষন্ন-মধুর অভিজ্ঞতার সমান্তরালে চলে আসছে। বিবাহিতা কন্যার পিত্রালয়ে আগমন এবং বিদায়ে বাঙালী জননী বা মেনকার আনন্দোৎকণ্ঠা ও অশ্রুঘন বেদনার মর্মস্পর্শিতা অনুভব করেন। কাজেই, বাঙালী জননীর নিকট তখন দেবী দুর্গা আর স্বীয় কন্যা একই স্নেহবাৎসল্যের স্পর্শে দ্রবীভূত হয়ে একাত্মতা লাভ করেন। মাতৃসাধন বাঙালী সঙ্গীতের সুরে বিবাহিত কন্যার সঙ্গে মিলনপ্রত্যাশী বাঙালী মাতার অন্তরবেদনাকেই মুক্তি দিয়েছে : “যাও যাও গিরি, আনিতে গৌরী, উমা আমার কত কেঁদেছে।
উপসংহার: শারদোৎসব প্রকৃতপক্ষে বাংলার পারিবারিক জীবনে মিলনােৎসবের মাধুর্য নিয়েই আবির্ভূত হয়। সুদীর্ঘে প্রবাসজীবনযাপন করে প্রিয়জন ফিরে আসে জননীর স্নেহাঞ্চলতলে, আনন্দ-হাসিতে মুখর হয় বাঙালীর গৃহ-প্রাঙ্গণ। ধরাতলে রচিত হয় গিরীশ মেনকার সুখতৃপ্ত সংসারের দ্বিতীয় রূপ। তাই বাঙালীই নিঃসঙ্কোচ সারল্যে বলতে পেরেছে-‘দেবতারে মােরা আত্মীয় জানি।
See less